সামরিক বাজেট রেকর্ড পরিমাণ বাড়িয়ে ‘ড্রিম মিলিটারি’ টিম গড়তে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এ সামরিক উচ্চাভিলাষ গত সপ্তাহে শেয়ারবাজারে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের অন্য এক বার্তা মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেখানে কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এও জানান, নির্দেশ না মানলে কোম্পানিগুলোর শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন সীমিত করা হবে। এ হুমকি পুরো খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। খবর এফটি।
এক নির্বাহী আদেশে গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ প্রদান, শেয়ার বাইব্যাক ও শীর্ষ নির্বাহীদের বেতনের ওপর কড়াকড়ি আরোপের কথা বলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই আদেশের পর পরই ২০২৭ সালে সামরিক ব্যয় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেড় ট্রিলিয়ন বা দেড় লাখ কোটি ডলার করতে কংগ্রেসকে আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষ করে দেরিতে প্রকল্প শেষ হওয়া ও বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য একাধিক মন্তব্যে কোম্পানিগুলোর ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে শেয়ারহোল্ডার ও নির্বাহীদের প্রতি হুমকি, অন্যদিকে ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাব্য জোয়ার—বিপরীত মেরুর দুই সংকেত প্রতিরক্ষা খাতকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে এবং উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বিনিয়োগকারীদের।
পরামর্শক সংস্থা ক্যাপিটাল আলফা পার্টনার্সের বিশ্লেষক বাইরন ক্যালানের মতে, ট্রাম্পের ঘোষণায় শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফার জন্য ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে, কিন্তু কোম্পানিগুলো নিয়মিত চাপের মুখোমুখি থাকবে। পরিস্থিতি এমন হলে বিনিয়োগকারীরা প্রতিরক্ষা খাতে অর্থ ঢালবে না, বরং পুঁজি সরিয়ে নেবে।
ভেনিজুয়েলাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে শক্তিশালী ও ভালোভাবে অর্থায়িত সামরিক বাহিনীর ওপর জোর দিচ্ছেন ট্রাম্প। সামরিক এ উচ্চাভিলাষে ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার ও তাদের যুদ্ধ সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। পেন্টাগনের ক্রয় ব্যবস্থা সংস্কারকেও এখন অগ্রাধিকার দিচ্ছেন ট্রাম্প। তার লক্ষ্য হলো ব্যয় সাশ্রয় ও সরবরাহ দ্রুততর করা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, উৎপাদন বাড়াতে পর্যাপ্ত নিজস্ব মূলধন বিনিয়োগ করছে না কোম্পানিগুলো।
গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে প্রতিরক্ষা খাতের নির্বাহীদের বেতনকে ‘অত্যধিক ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। এর পরই নতুন কারখানা গড়ে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন তিনি। আরো বলেন যে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে না তোলা পর্যন্ত কোম্পানি নির্বাহীদের বার্ষিক বেতন ৫০ লাখ ডলারে সীমাবদ্ধ করা হবে।
জেফারিসের বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩-২৪ সালে শীর্ষ প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের তুলনায় শেয়ারহোল্ডারদের রিটার্ন বেশি ছিল। ওই সময় প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলার ফেরত পেয়েছে শেয়ারহোল্ডাররা এবং পুনর্বিনিয়োগ করেছে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
লভ্যাংশের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার খবরের পর প্রতিরক্ষা খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর পড়ে যায়। তবে বাজেট বাড়ানোর সম্ভাবনার খবরে গত বৃহস্পতিবার কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর বেড়ে যায়।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নির্মাতা নর্থরপ গ্রুম্যানের সাবেক নির্বাহী ও ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক সিএসআইএসের সেন্টার ফর দ্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেজের পরিচালক জেরি ম্যাকগিন বলেন, ‘ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও তার প্রশাসন বুঝতে পেরেছে, প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সরকারকে বড় অংকের প্রণোদনা দিতে হবে।’
লকহিড মার্টিনের সঙ্গে সম্প্রতি সাত বছরের জন্য প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে একটি কাঠামোগত চুক্তি ঘোষণা করেছে পেন্টাগন। এ ধরনের প্রকল্প সাধারণত স্বল্পমেয়াদি হলেও সেই তুলনায় এ চুক্তির মেয়াদ অনেক দীর্ঘ।
এয়ারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এরিক ফ্যানিং বলেন, ‘ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুততর করার ওপর প্রশাসনের জোরালো আহ্বানকে স্বাগত জানাচ্ছে শিল্প খাত। স্থিতিশীল চাহিদার সংকেত ও স্পষ্ট প্রয়োজনীয়তাই বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।’
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা খাতে পারফরম্যান্সে কোন কোন কোম্পানি পিছিয়ে আছে তা চিহ্নিত করতে হবে। এজন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ৩০ দিন সময় দিয়েছেন তিনি। এ পর্যালোচনায় চুক্তি বাস্তবায়নে দুর্বলতা বা উৎপাদনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত। কোম্পানিগুলো যদি সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে ‘তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা’ও নিতে পারবেন হেগসেথ।
আদেশে আরো বলা হয়েছে, ৬০ দিনের মধ্যে ভবিষ্যৎ চুক্তির ক্ষেত্রে কিছু শর্ত যুক্ত করতে হবে। খারাপ পারফরম্যান্স, চুক্তি লঙ্ঘন, অগ্রাধিকারের অভাব, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ বা ধীর উৎপাদনের ক্ষেত্রে শেয়ার বাইব্যাক ও লভ্যাংশ নিষিদ্ধ করতে পারবেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী।
মূলধন ফেরতের ওপর নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি কতটা শক্ত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের। এতদিন প্রতিরক্ষা খাতের শেয়ারকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ভাবা হলেও ট্রাম্পের আদেশ কোম্পানিগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
সিএসআইএসের ম্যাকগিনের মতে, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এড়াতে কোম্পানিগুলো স্বল্পমেয়াদে লভ্যাংশ ও বাইব্যাক থেকে বিরত থাকতে পারে। তবে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে সঠিক প্রণোদনা না পেলে চোখ বন্ধ করে লগ্নি করবে না বিনিয়োগকারীরা।